চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির ৪ বছর
ফয়সাল খান
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০৮:৩২ এএম
আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১০:৩১ এএম
ঢাকার চুড়িহাট্টার ওয়াহিদ ম্যানশনে ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি আগুন লেগে ৭১ জন মারা যান। ওই ঘটনায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের আত্মার শান্তি কামনায় ভবনটিতে ব্যানার টানিয়েছেন স্থানীয়রা। প্রবা ফটো
২০১০ সালে পুরান ঢাকার নিমতলীতে ১২৪ ব্যক্তি আগুনে পুড়ে মারা যান। ঘনবসতিপূর্ণ এ এলাকা থেকে তখন রাসায়নিক পদার্থের গুদাম ও প্লাস্টিক কারখানা সরানোর দাবি সব মহলে জোরালো হয়। কেমিক্যালপল্লী স্থাপনের উদ্যোগ নেয় সরকার। সেই প্রকল্পে ধীরগতির মধ্যে ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকা দেখে আরেক ট্র্যাজেডি। চুড়িহাট্টার ওয়াহিদ ম্যানশনে আগুন লেগে রাসায়নিক পদার্থের আগুনে পুড়ে মারা যান ৭১ জন।
আজ ২০ ফেব্রুয়ারি সেই চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির চার বছর। সে ঘটনার এখনো বিচার হয়নি। মেলেনি ক্ষতিপূরণ। শেষ হয়নি কেমিক্যালপল্লী স্থাপনের কাজ। কাজটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শেষ হতে পারে। তারপর সেখানে যাবে এবং গাজীপুরের টঙ্গী ও পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গুদাম।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পুরান ঢাকায় এখনও বেশিরভাগ আবাসিক ভবনের নিচতলায় রাসায়নিক, সুগন্ধি ও প্লাস্টিকের ব্যবসা চলছে। ওয়াহেদ ম্যানশন সংস্কার করে বিভিন্ন ব্যাংক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
পুরান ঢাকার সব কেমিক্যাল গোডাউন অবৈধ
২০১৮ সাল থেকে পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল ব্যবসায় ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ রেখেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এ এলাকায় কোনো রাসায়নিক কারখানা বা গোডাউনের অনুমোদন দেয়নি বিস্ফোরক অধিদপ্তর। এরপরও অবৈধ ২০ হাজারের বেশি কেমিক্যাল গোডাউন বহালতবিয়াতে। তবে, ডিএসসিসির হিসাবে এ এলাকায় কেমিক্যাল গোডাউনের সংখ্যা ১ হাজার ৯২৪।
তা ছাড়া বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-১৯৯৭ অনুযায়ী, বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে কোনো শিল্প ইউনিট আবাসিক এলাকায় এবং তার আশপাশে কাজ করতে পারে না। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দুর্বল মনিটরিংয়ের সুযোগে সেখানে ব্যবসা চালু রয়েছে।
বিচার হয়নি, মেলেনি ক্ষতিপূরণ
অগ্নিকাণ্ডের চার বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার ও ক্ষতিপূরণ পায়নি চুড়িহাট্টার ক্ষতিগ্রস্তরা। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি অগ্নিকাণ্ডের এক দিন পর নিহত হওয়া একজনের ছেলে বাদী হয়ে মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ ওয়াহেদ ম্যানশনের দুই মালিক মোহাম্মদ হাসান সুলতান, মোহাম্মদ হোসেন সুলতান ওরফে সোহেলসহ আটজনের বিরুদ্ধে ২০২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অভিযোগপত্র দেয় আদালতে। অন্য আসামিরা হলেন রাসায়নিক গুদামের মালিক ইমতিয়াজ আহমেদ, মোজাম্মেল ইকবাল, মোজাফফর উদ্দিন, মোহাম্মদ জাওয়াদ আতিক, মোহাম্মদ নাবিল ও কাশিফ।
অষ্টম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের এপিপি মো. মাজহারুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে, অভিযোগপত্র দাখিলের প্রায় এক বছর পর গত ৩১ জানুয়ারি আদালত আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। মামলায় ১৬৭ জন সাক্ষী আছেন। তারা জামিনে আছেন। কাউকেই এখনও জেরা করা হয়নি। আদালত মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ১৪ মার্চ দিন ধার্য করেছেন বলে জানান তিনি। অগ্নিকাণ্ডে নিহত মোহাম্মদ জুম্মনের ছেলে মামলার বাদী মো. আসিফুর রহমান অনিক বলেন, বছরের পর বছর ধরে সরকারি কর্মকর্তা-জনপ্রতিনিধিরা তাদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। যে প্রতিশ্রুতি ছিল তারা তার কিছুই পাননি।
তিনি বলেন, কোনো ন্যায়বিচার হবে না। সব আলামত থাকার পরও চার্জশিট দিতেই পুলিশ তিন বছর সময় পার করেছে। অভিযোগ গঠন করতে আরও এক বছর সময় নিয়েছেন আদালত। দগ্ধ ভবনটি পুনর্নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন মালিক। অনিক আরও বলেন, ডিএসসিসি প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের একজনকে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন করা হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত ৮৯টি পরিবারের মধ্যে ৩১ জনকে চাকরি দেওয়ার জন্য তালিকাভুক্ত করলেও ফাইলটি এখন অফিসে নেই। তা ছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিলেও উপার্জনক্ষম সদস্য হারানো পরিবারগুলোকে কিছুই দেওয়া হয়নি।
কেমিক্যাল গোডাউন সরাতে আরও তিন বছর
দীর্ঘদিন ধরে সরকারকে পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকা থেকে সব ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা স্থানান্তর করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন মানবাধিকারকর্মীরা। ২০১৫ সালে কেরানীগঞ্জের কোন্ডা এলাকায় প্লাস্টিক কারখানা ও কেমিক্যাল গোডাউন স্থানান্তরের একটি প্রকল্প নেয় সরকার। কিন্তু জায়গাটি জনবহুল হওয়ায় স্থানীয় জনগণ এর প্রতিবাদ করে। এরপর বিসিক প্রকল্পটি মুন্সীগঞ্জে স্থানান্তর করে।
বিসিক প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের প্রকল্প পরিচালক মো. আনিস উদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, নানা জটিলতায় প্রকল্পটির জায়গা বেশ কয়েকবার স্থানান্তর করা হয়েছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী ২১৮ দশমিক ১৬ কোটি টাকার প্রকল্পে ৩৬৫টি প্লট রয়েছে। পুরো প্রকল্পের কাজ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে। সীমানাপ্রাচীর ও মাটি ভরাটের কাজ মিলিয়ে প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৪৬ শতাংশ বলে জানিয়েছেন বিসিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের প্রকল্প পরিচালক মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান।